১
শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি পাড়ায়, টিনের ছাউনি দেওয়া একতলা বাড়িতে থাকত রাহাত। বাড়ির সামনে ছোট্ট উঠোন, সেখানে একটি আমগাছ আর পাশে বাবার যত্নে লাগানো কয়েকটা শাকসবজির গাছ। বাইরে থেকে দেখলে বাড়িটা সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ছিল স্বপ্নের ভাণ্ডার।
রাহাত ছিল মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। তার বাবা আব্দুল করিম একটি প্রাইভেট অফিসে ছোট চাকরি করতেন। মাসের শেষে বেতন পেলেই হিসাবের খাতা খুলে বসতেন—বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, রাহাতের স্কুলের ফি—সবকিছুর তালিকা। মা শামিমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের খরচ বাঁচাতে তিনি নিজের পুরোনো শাড়ি সেলাই করে নতুনের মতো বানাতেন, বাজার থেকে সবজি কিনে আনার পর যত্ন করে কেটে রেখে দিতেন যেন কিছু নষ্ট না হয়।
রাহাতের ছোটবেলা কেটেছে খুব সাধারণভাবে। খেলনা বলতে ছিল একটা প্লাস্টিকের বল আর ভাঙা চাকার একটি গাড়ি। কিন্তু তার কল্পনা ছিল অসীম। সে বলত, "একদিন আমি বড় হয়ে অনেক বড় মানুষ হবো, আমাদের বাড়িটাকে নতুন করে বানাবো।"
২
স্কুলে রাহাত ছিল মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে প্রথম না হলেও সবসময় ভালো ফল করত। শিক্ষকরা বলতেন, "এই ছেলেটার চোখে স্বপ্ন আছে।" কিন্তু সেই স্বপ্নের পেছনে ছিল কঠোর বাস্তবতা।
একদিন স্কুলে ঘোষণা হলো—শিক্ষাসফর হবে শহরের বাইরে। সবার কাছ থেকে নির্দিষ্ট টাকা নেওয়া হবে। বাড়ি ফিরে রাহাত চুপচাপ ছিল। মা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে?"
রাহাত দ্বিধা নিয়ে বলল, "মা, স্কুলে ঘুরতে যাবে সবাই। টাকা লাগবে।"
বাবা কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, "চিন্তা করিস না। তুই যাবি।"
সেই রাতে রাহাত দেখল, বাবা অনেকক্ষণ ধরে হিসাব করছেন। পরের সপ্তাহে মা নিজের সোনার ছোট কানের দুল বন্ধক রাখলেন। রাহাত বুঝতে পারল—তার আনন্দের পেছনে কত ত্যাগ লুকিয়ে আছে। শিক্ষাসফরে গিয়ে সে খুব আনন্দ করলেও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—একদিন সে বাবা-মায়ের সব কষ্ট দূর করবে।
৩
সময় গড়াল। মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর। রাহাত দিন-রাত পড়াশোনা করত। পাড়ার বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত, সে তখন টেবিলে বসে বই খুলে থাকত। মাঝে মাঝে মন খারাপ হতো, কিন্তু বাবার ক্লান্ত মুখ আর মায়ের অব্যক্ত আশা তাকে নতুন শক্তি দিত।
পরীক্ষার ফল বেরোল। রাহাত জেলায় মেধা তালিকায় স্থান পেল। পুরো পাড়া আনন্দে ভরে গেল। বাবা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, "আজ আমার ছেলে আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে।"
কিন্তু সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—উচ্চমাধ্যমিক আর তারপর কলেজ। ভালো কলেজে ভর্তি হতে টাকা লাগবে। রাহাত ঠিক করল, সে টিউশনি করবে। সন্ধ্যায় পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতে শুরু করল। প্রথম মাসে হাতে যখন নিজের উপার্জিত টাকা পেল, সে সেটা মায়ের হাতে তুলে দিল।
মা বললেন, "এই টাকাটা তোর নিজের জন্য রাখ।"
রাহাত হেসে বলল, "আমার নিজের তো তোমরাই।"
৪
কলেজে ভর্তি হলো রাহাত। শহরের নামকরা কলেজে পড়ার সুযোগ পেল। পড়াশোনার পাশাপাশি সে লাইব্রেরিতে সময় কাটাত, নতুন বই পড়ত, বড় স্বপ্ন দেখত। মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগত, মনে হতো এত সংগ্রাম কেন? কিন্তু তখনই মনে পড়ত—মায়ের বন্ধক রাখা দুল, বাবার হিসাবের খাতা।
একদিন কলেজে একটি সেমিনারে একজন সফল উদ্যোক্তা বলছিলেন, "স্বপ্ন দেখতে হলে সাহস লাগে, আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে লাগে অধ্যবসায়।" এই কথা রাহাতের মনে গেঁথে গেল।
সে সিদ্ধান্ত নিল, শুধু চাকরি নয়—নিজের কিছু করবে। পড়াশোনা শেষ করে সে একটি ছোট স্টার্টআপ শুরু করল। শুরুটা ছিল কঠিন। অনেকেই বলল, "মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, এত বড় স্বপ্ন দেখিস কেন?"
কিন্তু রাহাত থামেনি। সে জানত, তার পেছনে আছে তার পরিবারের বিশ্বাস।
৫
বছর কয়েক পর সেই ছোট উদ্যোগ বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নিল। শহরে একটি অফিস, কয়েকজন কর্মচারী—সব মিলিয়ে রাহাত এখন একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা।
প্রথম বেতন থেকেউপসংহার
মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হওয়া মানে শুধু সীমাবদ্ধতা নয়—এটা মানে সংগ্রাম, ত্যাগ আর স্বপ্নের গল্প। রাহাতের জীবন প্রমাণ করে, অর্থের অভাব স্বপ্নকে থামাতে পারে না। যদি মন দৃঢ় হয়, যদি পরিবার পাশে থাকে, তাহলে ছোট ঘর থেকেও বড় আকাশ ছোঁয়া যায়।
রাহাত আজও মাঝে মাঝে পুরোনো হিসাবের খাতা খুলে দেখে। সেখানে বাবার হাতের লেখা, মায়ের নীরব ত্যাগ—সবকিছু যেন তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে কোথা থেকে এসেছে।
আর সে মনে মনে বলে—
"আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, আর এই পরিচয়ই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।"
যে ছেলে মায়ের হাতে টাকা দিয়েছিল, আজ সে বাবা-মায়ের জন্য নতুন বাড়ি বানাল। পুরোনো টিনের ছাউনি বদলে গেল পাকা ছাদে। উঠোনে নতুন আমগাছ লাগাল
