স্বার্থপর প্রেমিকের কাহিনী
(পৃষ্ঠা – ১)
রিমি প্রথম দিনেই বুঝেছিল, আরিয়ান অন্যরকম। ঢাকা শহরের এক ব্যস্ত বিকেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তাদের পরিচয়। আরিয়ানের আত্মবিশ্বাসী হাসি, সাবলীল কথা বলা—সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। রিমি ধীরে ধীরে তার কথায়, তার স্বপ্নে, তার প্রতিশ্রুতিতে জড়িয়ে পড়েছিল।
আরিয়ান বলত, "তুমি না থাকলে আমি কিছুই না।"
কিন্তু কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অন্য এক সত্য।
প্রথম কয়েক মাস সবকিছু ছিল স্বপ্নের মতো। প্রতিদিন ফোন, দীর্ঘ মেসেজ, হঠাৎ হঠাৎ ফুল নিয়ে হাজির হওয়া। রিমি ভাবত, সে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মেয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে আরিয়ানের আচরণ বদলাতে শুরু করল।
রিমির কোনো সাফল্যে সে খুশি হতো না। বরং বলত, "এত বাইরে যাওয়ার দরকার কী? আমাকে সময় দাও।"
রিমি যদি বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও যেত, আরিয়ান রাগ করত। যদি পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকত, সে অভিযোগ করত—"তোমার কাছে আমি গুরুত্বপূর্ণ নই।"
রিমি বুঝতে পারছিল না—ভালোবাসা কি এমনই হয়?
(পৃষ্ঠা – ২)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ানের স্বার্থপরতা স্পষ্ট হতে লাগল। সে চাইত রিমি শুধু তার কথাই শুনবে, তার ইচ্ছামতো চলবে। রিমির স্বপ্ন—বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া—শুনে সে হেসে বলেছিল,
"আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? তাহলে ভালোবাসা কিসের?"
রিমি চুপ করে গিয়েছিল। সে ভাবত, হয়তো সত্যিই ভালোবাসার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাই নিজের ইচ্ছেগুলো একে একে গুছিয়ে রাখতে শুরু করল।
একদিন রিমির বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির মধ্যে সে আরিয়ানকে ফোন করেছিল। আরিয়ান বিরক্ত স্বরে বলেছিল,
"আজ আমার প্রেজেন্টেশন আছে। এসব নিয়ে আমাকে এখন বিরক্ত করো না।"
সেদিন রিমির ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গিয়েছিল।
সে বুঝতে পারল—যে মানুষ তার কষ্টের সময় পাশে থাকে না, সে কেবল নিজের সুবিধার জন্যই ভালোবাসে।
(পৃষ্ঠা – ৩)
কয়েকদিন পর রিমি সিদ্ধান্ত নিল, সে কথা বলবে।
ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সে বলল,
"তুমি কি কখনো আমার কথা ভেবেছ?"
আরিয়ান হেসে বলল, "আমি তো সবসময় তোমার ভালো চাই।"
"তোমার ভালো, না আমার?"—রিমির প্রশ্নে সে থেমে গেল।
রিমি বুঝতে পারল, আরিয়ানের ভালোবাসা আসলে অধিকারবোধ। সে ভালোবাসত, কিন্তু নিজের মতো করে—যেখানে রিমির স্বপ্ন, ইচ্ছে, কষ্টের কোনো জায়গা নেই।
সেদিন রিমি বলেছিল,
"ভালোবাসা যদি শ্বাসরোধ করে, তাহলে সেটা ভালোবাসা নয়। সেটা বন্ধন।"
আরিয়ান রাগে চলে গিয়েছিল। সে ভাবতেই পারেনি, রিমি এমন কথা বলতে পারে।
(পৃষ্ঠা – ৪)
বিচ্ছেদের পর প্রথম কয়েকদিন রিমির খুব কষ্ট হয়েছিল। ফোনের পুরোনো মেসেজ, ছবিগুলো তাকে কাঁদাত। কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেল।
সে আবার পড়াশোনায় মন দিল। নিজের স্বপ্নগুলো তুলে আনল আলোর মুখে। পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করল। বুঝতে পারল—ভালোবাসা মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়, বরং একসঙ্গে বড় হওয়া।
কয়েক মাস পর আরিয়ান ফিরে এসেছিল।
বলেছিল, "আমি বদলে গেছি। আরেকবার সুযোগ দাও।"
রিমি শান্তভাবে বলেছিল,
"ভালোবাসা ভিক্ষা নয়। আর সম্মান ছাড়া ভালোবাসা টেকে না।"
আরিয়ান নীরবে চলে গিয়েছিল।
রিমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। তার চোখে আর জল ছিল না—ছিল আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।
স্বার্থপর প্রেমিক তাকে ভেঙে দিতে পারেনি।
বরং শিখিয়েছে—নিজেকে ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
শেষ।
